তখনো প্রযুক্তির ছিটে ফোঁটা পায়নি গ্রাম। অথচ সেই অজপাড়া গাঁয়ের সঙ্গে সেতুবন্ধন রচনা করেছেন তিনি। গড়ে তুলেছেন হাইওয়ে। যেই হাইওয়ে দিয়ে নির্বিঘ্নে টেনে নেয়া গেছে ব্রডব্যান্ডের ক্যাবল। সেই সড়ক বেয়ে আজ ফোন করা মাত্রই খেতের সব্জি পৌঁছে যেতে পারছে নাগরিকের ঘরের দরজায়। ঢাকার রাস্তার চাপ সামাল দিতে উড়াল সেতুর স্বপ্নটাও দেখিয়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁর সম্পর্কে কতটুকু জেনেছে নতুন প্রজন্ম?
বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নের রূপকার কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের ৭৬তম জন্মজয়ন্তীতে সে কথাটাই ঘুরে ফিরে এসেছে বারবার।
অবশ্য তাঁর জন্মবার্ষিকীতে পরম শ্রদ্ধায় তাকে স্মরণ করেছেন তার অনুজেরা। বাদ আসর এলজিইডি সদর দপ্তর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় দোয়া অনুষ্ঠান। এসময় প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ আব্দুর রহিম, প্রকৌশলী শেখ তাজুল ইসলাম তুহিন এবং তাঁর আজীবন ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ফেরদৌস আলী মোল্লা ছাড়াও প্রতিষ্ঠানের সর্বস্তরের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
আর যেসকল কর্মকর্তারা কাজের কারণে স্বশরীরে উপস্থিত হতে পারেননি, তারা অনলাইনে এই দোয় অনুষ্ঠানে যোগ দেন। মরহুমের রুহের মাহফরাত কামনা করে তাকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানান দেশের সবচেয়ে প্রাচীন পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, বাংলাদেশ (আইইবি) এর প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী মো. নুরুল হুদা।
এছাড়াও দোআ অনুষ্ঠানে আমৃত্যু জনকল্যাণে নিজ কর্মগুণেই জ্যোতির্ময় কামরুল ইসলাম সিদ্দিক বেহেস্তের সর্বোচ্চ স্থানে জায়গা করে নিয়েছেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন দোয়া পরিচালনাকারি এলজিইডি সদর দপ্তর কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম হাফেজ মোঃ আব্দুল জব্বার।
গ্রমীণ অবকাঠামোতে আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়া দেয়া এই কিংবদন্তীর জন্ম ও মৃত্যু বার্ষিকী জাতীয় ভাবে পালনের মধ্য দিয়ে সরকার গুণী মানুষের প্রতি যথাযোগ্য সম্মান দেখাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
প্রাঙ্গজনদের পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের কীর্তি তুলে ধরে বিভিন্ন পোস্ট দিয়েছেন তাঁর উত্তরসূরিরা। তথ্যচিত্রে কিংবদন্তি এই জ্যেতির্ময়ের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন সোশ্যাল মিডিয়ার সরব প্রকৌশলী টুটুল সমাজির মতো অনেকেই।
প্রসঙ্গত, ১৯৪৫ সালের ২০ জানুয়ারি কুষ্টিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। তার পিতার নাম নূরুল ইসলাম সিদ্দিক এবং মাতা বেগম হামিদা সিদ্দিক। কামরুল এই দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান। তিনি কুষ্টিয়াতে প্রাথমিক ও ১৯৬০ সালে মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। পরে ১৯৬২ সালে কুষ্টিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। ১৯৬৬ সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রকৌশল ও কারিগরী বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭৭ সালে শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নগর ও আঞ্চলিক পরিকল্পনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৬৭ সালে কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ৩০ এপ্রিল যুদ্ধে যোগদান করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকৌশলী হিসেবে তিনি মুক্তি বাহিনীকে সহায়তা প্রদানে বিভিন্ন রাস্তা ও সেতুর নকশা প্রণয়ন করে যুদ্ধের অপারেশনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি প্রথমে পল্লী কর্মসূচির উপ-প্রধান প্রকৌশলী এবং পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রনালয়ের আওতায় নগর নির্মাণ কর্মসূচির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯২ সাল পর্যন্ত স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী ব্যুরোতে প্রকৌশল উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার পর তিনি প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোগত সংস্কার সাধন করে স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি এর প্রধান ছিলেন।
১৯৯৯ থেকে ২০০০ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান, ২০০০ সালে যমুনা সেতু ডিভিশন ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব, ২০০০ থেকে ২০০১ পর্যন্ত গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রনালয়ের সচিব, ২০০১ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বেসরকারীকরণ কমিশনের চেয়ারম্যান এবং ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
তিনি ২০০৩ থেকে ২০০৪ মেয়াদে গ্লোবাল ওয়াটার পার্টনারশিপ-দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের চেয়ায়পার্সন ছিলেন।
ব্যক্তিগত জীবনে সাবেরা সিদ্দিকের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। এই দম্পতির এক ছেলে এবং তিন কন্যা সন্তান রয়েছে। তার পথ ধরেই ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অংশীজন হিসেবে প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও ব্যবসায় নিয়োজিত রয়েছের তার একমাত্র পুত্র ডিজিবাংলা সম্পাদক সাইফুল ইসলাম সিদ্দিক।
২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ৬৩ বছর বয়সে অনন্তের পথে পাড়ি জমান এই জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ।